আদিবাসী সমাজে নারীর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ

আদিবাসী সমাজে নারীদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা

ভূমিকা: আদিবাসী জীবনে নারীর স্থান অনেক উচ্চে। এ সমাজে নারী একজন সম্পূর্ণ মানুষ। এ সমাজে ঘরের মধ্যে নারী স্বাধীন, ঘরের বাইরের ও স্বাধীন। আদিবাসী সমাজে নারী কাজ করায় স্বাধীনতা নিয়েই জন্যায় এবং বোড় ওঠে। আদিবাসী জীবনে ধর্ষণ, শোষণ এসব ছিল না। গাড়ো ভাষায় নারীদের অবনমিত সে লাঞ্ছিত করে এমন কোনো শব্দই নেই। সংসারের নকল কাজে আদিবাসী নারী পুরুষ সঙ্গী থাকে। অনেক আদিবাসী। সমাজে নারীকে রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আদিবাসী সমাজে কোনো বরপণ ছিল না, যৌতুক নেয়া হতো না। এখানে তাই যৌতুকের কারণে নারী  নির্যাতন ঘটে না।

আদিবাসী সমাজে নারীর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ

আদিবাসী সমাজে নারীদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান

১. সমাজ ও পরিবারে আদিবাসী নারীর অবস্থান:

সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা আদিবাসী ঐতিহোর প্রধানতম অনুষঙ্গ। এই সমতা কেবল অর্থনৈতিক দিকে দিয়েই নয়, বরং স্বনির্ভরতার অন্যতম স্তম্ভ। ফলে বাঙালি সমাজের মতো তাদের উপেক্ষিত হতে হয় না। নিজেরাই নিজেদের পরিবার ও সমাজে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান তৈরি করে নেয়। সুখের দিনে, দুঃখের দিনে উৎসব। আয়োজনে এই সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বন্ধুপ্রতিম। নারী এখানে সম্পূর্ণ মানুষ। তারা ঘরে বাইরে সর্বত্র স্বাধীন, যতটা স্বাধীনতা নিয়ে একটি মানুষ জন্মায়। আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত উপকথা, লোককথা, ছড়া, কাহিনি প্রভৃতি মৌলিক সাহিত্যে নারীর অবস্থান অনেক উর্ধ্বে। গারো ও খাসিয়া ভিন্ন এদেশের সকল আদিবাসী সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হলেও কারণে অকারণে পিতৃতন্ত্রের পীড়ন নেমে আসে না আদিবাসী নারীদের ওপর।

তবে প্রতিবেশী বাঙালিদের প্রথাগত যৌতুক-সংস্কৃতির সংক্রমণে কলুষিত হচ্ছে আদিবাসী নারীর স্বপ্ন জগৎ। নিজ সমাজ ও নিজ পরিবারে নারীর অবস্থান সহনীয় হলেও, বিয়ের পর অধিকাংশ নারীর দুর্ভোগের জীবন শুরু হয়। একই পুরুষ পিতা হিসেবে কন্যার জন্য যতটা সহমর্মী, স্বামী হিসেবে ততটা নয়। অধিকাংশ আদিবাসী পরিবারে এই বাস্তবতা অতিক্রান্ত সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অথচ কয়েক বছর আগেও মেয়ের বাবাকে উপযুক্ত পণ দিয়ে বিয়ে করাতে হতো আর এখন ছেলে পক্ষকে খুশি করতে হয় সবার আগে। অথচ বাঙালি সমাজে অধিকাংশ নারী বিয়ের পর ঘর-গৃহস্থালির কাজের মধ্য অবদ্ধ থাকলেও আদিবাসী নারীকে বিয়ের পরপরই স্বামীর মত কাজের সন্ধানে বাইরে বেরোতে হয়। তবুও তাদের যৌতুক নিতে হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলোর মধ্যে যৌতুকের প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় যেমন তাদের বিবাহরীতি স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বেড়ে যাচ্ছে যৌতুক, পারিবারিক অশান্তি ও নারী শিক্ষায় ক্রমাবনতি।

অধিকাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক আইনে পিতা ও স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে কন্যা ও স্ত্রীর কোনো অধিকার থাকে না। এক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক মাহাতো সম্যাজর কথা উল্লেখ করা হয় যেখানে জমি বা সহায়-সম্পত্তিতে কন্যা সন্তানের অধিকার থাকেনা। তবে মায়ের কাছে থেকে আংশ পাওয়ার সামাজিক রীতি রযেছে। একইভাবে মাহাতো সমাজে পবিবারে পিতার পুত্র সন্তান না থাকলে সেক্ষেত্রে মেয়েদের পূর্বে পিতার সম্পত্তিতে অধিয়ার পায় পিতার ভাইয়ের ছেলেরা। মোট সম্পত্তির ৪ ভাগের তিন ভাগ পায় ভাইয়ের ছেলে ১ ভাগ পায় কন্যারা। কিন্তু সম্প্রতি এর কিছুটা পরিবর্তন ঘটছে। এখন অধিভাংশ পিতা তার ভাইয়ের ছেলেদের চেয়ে তার কন্যাদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছেলে না থাকালে মৃত্যুর পর ভাইয়ের ছেলেকে দিয়ে মুখে আগুন দিতে হয়। এজন্যে ভাইয়ের ছেলেদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না। এটাই মাহাত্মাদের সামাজিক রীতি।

আদিবাসি নারীদের রাজনৈতিক অবস্থান:

অনেক আনিবাসী স্বামীর হাতে বা বয়স্ক পুরুষের হাতে ন্যস্ত। মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী সমাজে সম্পত্তি ও বংশনাম মাতৃসূত্রীয় ধারায় বর্তায়। এক্ষেত্রে পরিবার মাতৃপ্রধান।

অদিবাসী সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিচার কাজ করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে একক নেতৃত্ব সমাজ গড়ে ওঠেনি। তবে স্থানীয় নেতৃত্ব ঐতিহ্যগতভাবে নারীবর্জিত। কিন্তু সম্প্রতি এসব ক্ষেত্রে নারীদের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। বর্তমানে আদিবাসী সমাজে কেন্দ্রীয় প্রশাসন যন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে বিধায় বর্তমানে নেতৃত্ব ও বিচারেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

আদিবাসী নারীদের অর্থনৈতিক অবস্থা আদীবাসী সমাজে  নারী, পুরুষের চেয়ে উদ্ভাবন শক্তি বেশি এবং নারীরাই স্থানীয় ঐতিহ্য আর  জ্ঞানের বাহন। বাঙালি হিন্দু ও মুসলামান সমাজের নারীদের মত এদের জীবনের পুরোভাগ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ নয়। জীবিকানির্বাহসহ প্রয়োজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পুরুয়ের সহযোগী, সহকর্মী। প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের নারীদেন মতো আদিবাসী নারীরা কেবল রান্নাঘর এ গৃহবধুর ভূমিকা পালন করে না, তারা ঘরের বাইরে খেত খামারের কাজে জুম চাষে যায়,  নিজ হাতে খরচাপাতি করে, উৎসব-আয়োজনে একত্রে মদপান করে।

কিছু কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ে পূর্বে সামাজিকভাবে বাইরে কাজ করায় ক্ষেত্রে, নারী-পুরষের বিভেদ থাকলেও বর্তমানে তাদের নিত্য অভাব সেই সামাজিক প্রথাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে বিভেদ নেই। তবে মজুরির বেলায় কিছুটা বিভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে তা অঞ্চলেভেদে ওঠা নামা করে। আদিবাসী নারীরা কর্মক্ষেত্রেও একই রকমভাবে অবমূল্যায়িত। দু-একটি বাদে সব এলাকার আদিবাসী নারী দিনমজুর যা শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্যের শিকার। কোথাও এই বৈষম্যের পরিমাণ শতকরা ১০ ভাগ, কোথাও ৪০ ভাগ। অথচ পুরুষরাও স্বীকার করে নারীো তাদের চেয়ে বেশি শ্রম দেয়। কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় আদিবাসী নারীদের এই বৈষম্য মুখ বুঝে মেনে নেয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না।

অথচ আদিবাসী সমাজের পুরুষদের চেয়ে নারীরা সবসময়েই বেশি শ্রম দেয়, যাবতীয় ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত বেশি সচেতন।। কিন্তু তবুও খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের মতামতের মূল্য দেয়া হয় বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য ও প্রতাব বজায় রাখতে এটাই যেন স্বাভাবিক নিয়ম। অধিকাংশক্ষেত্রেই নারীরাই দিনশেষে মাতাল স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন। কোনো কোনো পুরুষ মদ খেয়ে অলস হয়ে বেকার জীবন কাটায়। অবশ্য এক্ষেত্রে গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীতে নারীর অবস্থান ব্যতিক্রম এবং তা সম্ভব হয়েছে কেবল সেখানে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু হয়েছে বলে।

আদিবাসী নারীদের ক্ষমতায়ন:

কৃষিভিত্তিক সভ্যতার শুরুর পথে অধিকাংশ বা প্রায় সকল জাতির সমাজব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক ছিল। কেননা, পুরুষরা সাধারণত পশুপালনে প্রবৃত্ত থাকত। এরপর যখন দেখা যায়, পশুপালনের চেয়ে কৃষিকাজ অধিক লাভজনক, তখন পুরুষরা ক্রমশ নারীদের কাছে থেকে কৃষিকে নিজেদের অধিকারে নিতে থাকে এবং এমনি করে এক সময় সারা সমাজব্যবস্থাকেই পুরুষদের মর্জিমাফিক রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী বিন্যস্ত করে। একইভাবে শুরু হয় নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের বহুমুখী আইন ও বৈধ অন্যায় আচরণের। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে ক্রমশ বিলুপ্ত হতে থেকে থাকে নারীর জম্মগত স্বাধীনতা।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আদিবাসীদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান সমাজের বাহণ মতো নয়। আদিবাসী সমাজে নারী পুরুষের চেয়ে উদ্ভাবন শক্তি বেশি এবং নারীরাই স্থানীয় ঐতিহ্য জীবিকানির্বাহসহ, রাজনৈতিক প্রশাসনিক প্রয়োজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পুরুষের সহযোগী সহকর্মী।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী কারা? নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা কর

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী কারা? মাইনোরিটি গ্রুপ হিসেবে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা

ভূমিকা: কোনো মানুষের ৪০% বা তার চেয়ে বেশিমাত্রায় শারীরিক অসমর্থতাই হলো অক্ষমতা। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, অক্ষমতা হচ্ছে শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, মানসিক, অনুভূতি, বেড়ে ওঠা বা এগুলোর সমন্বিত ফলসম্পন্ন আঘাত যা কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক কাজে অংশগ্রহণের সক্ষমতার ক্ষেত্রে শাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এই অক্ষমতা জন্মের সময় থেকে বা জীবনের যেকোনো সময় হতে পারে। অক্ষমতা হচ্ছে দুর্বলতা, কর্মসম্পাদনের সীমাবদ্বতা বা অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী কারা? নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী:

"We are not disabled, we are differently abled" বস্তুত disabled, handicapped প্রস্তুতি

নেতিবাচক শব্দ পরিহার করে অধিকতর ইতিবাচক হিসেবে ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

Differently abled প্রত্যয়টি সর্বপ্রথম disabled-এর বিকল্প শব্দ হিসেবে ১৯৮০ সাল থেকে ব্যবহৃত হতে থাকে। US Democratic National Committee ১৯৮০ দশকের শুরুতে এই শব্দটি ব্যবহার শুরু করে। ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম দ্বারা অধিক ইতিবাচকতা প্রকাশ পায়, যা ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে সহায়ক হয়। ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম দ্বারা প্রকাশ করা হয় যে অনেক মানুষের অসমর্থতা থাকলেও, এই ব্যক্তিকে দিয়ে ব্যতিক্রমভাবে কোনো কাজ করা সম্ভব।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারীরা শুধু শারীরিক বা মানসিকভাবেই নয়, তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা সমাজ থেকে না পাওয়ার কারণেই তাদের অক্ষমতা প্রকাশ পায়। সমাজের দলিত, আদিবাসী যবা অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর তুলনায় ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম মানুষের অধিকারের বিষয়টি অতি সাম্প্রতিক আলোচিত হচ্ছে। যদিও ঐতিহাসিককাল থেকেই সমাজে এ ধরনের মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশে অসমর্থতা, অক্ষমতা, কানা, মুড়া ইত্যাদি শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অনেকে ক্ষেত্রে এ ধরনের শব্দগুলো মানুষকে অপমানিত করে এবং কষ্ট দেয়।

ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৫ জন নারীর ১ জন কোনো না কোনোভাবে ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম এর কারণে সংখ্যালঘু হয়। বস্তুত নিজের যত্ন নিতে না পারা, কায়িক শ্রম দিতে না পারা, হাঁটতে না পারা, দেখতে না পাওয়া, শুনতে না পাওয়া, বলতে না পারা, শ্বাসকই, পড়তে না পাড়া এবং কাজ করতে না পারা জনিত ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারীর সংখ্যাই বেশি।

পরিশেষে বলা যায়, ব্যতিক্রমভাবে সক্ষম নারী যে জাতি, বর্ণ, ধর্মের বা যেকোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক গোষ্ঠীরই হোক না কেন, তাদের মূলত কোনো না কোনো অক্ষমতা বা দুর্বলতা রয়েছে। ফলে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে তাদের যেমন সমস্যা হয় তেমনি গৃহে, বিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে এমনকি সমাজজীবনে বিভিন্ন বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়।

নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান একটি দেশ, অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এখানে অর্থাৎ গ্রামে বাস করে। এদের অর্ধেকেই নারী। এই জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ। নারীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সবচেয়ে পশ্চাৎগদ, অবহেলিত নির্বাচিত।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:

বাংলাদেশি সমাজে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়। নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখা হয় না। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা নারীকে আদর্শ, কোমলমতি, ভদ্র, নম্র, গৃহলক্ষী হিসেবে দেখতে ভালোবাসে। সমাজে নারী সম্পর্কে অনেক ধারণা রয়েছে, সেগুলো হলো- নারী হবে ঘরের লক্ষী, নারী ঘরের শোভা, নারী হবে নরম কোমল সহনশীল ও পতিসেবক, নারীর ইচ্ছা তার স্বামী ও পরিবারের ইচ্ছার কাছে সমর্পিত হবে, নারী লজ্জাশীল হবে ইত্যাদি।

পারিবারিক কাঠামো:

নারীর অধস্তনতার অন্যতম কারণ হলো পরিবারের পদক্রমিক কাঠামো। কেননা পারিবারিক কাঠামোর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে পুরুষের মর্যাদাবোধ এবং পারিবারিক পদক্রম। পদক্রমের উচ্চে থাকে পুরুষ কেবল পুরুষের অনুপস্থিতিতে নারীরা দায়িত্ব পান। সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান সর্বনিম্ন।

পুরুষের প্রতিনিধিত্ব

এদেশের পরিবার প্রধান পুরুষ তাই পরিবারের মুখপাত্র হিসেবে পরিবার প্রধানই প্রতিনিধিত্ব করে। এক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা পালনের কোনো সুযোগ নেই। নারীর অবস্থান সারাজীবন পরিবারের মাঝে। পরিয়ারের মধ্যেই তাদের জীবন কাটে। কখনো কন্যা, কখনো স্ত্রী, কখনো মাতা, কখনো ভগিনী হয়ে।

লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন

পরিবারে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন পরিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর অধস্তনতার অন্যতম একটি কারণ। পরিবার গড়িতে কাজ করে বলে যায়ী নগদ অর্থ আয় করতে পারে না এবং তার সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পুরুষের তুলনায় কম।

পুরুষ ও নারীর বৈষম্যতা

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নারীর নিম্ন মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পুরুষ কর্তৃক পরিবারের খানা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন। যেহেতু পুরুষই পরিবারের সর্বেসর্বা সেহেতু তারাই প্রয়োজনীয় কেনাকাটায় অর্থ জোগান দেয়। ফলে নারীদের ভূমিকা কমে যায়। পুরুষতন্ত্র পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর ভূমিকাকে সর্বনিম্নে দাঁড় করায়। কারণ সমাজে বিদ্যমান রীতিনীতি, আইনকানুন, ধর্ম, প্রথা প্রতিষ্ঠান সবয়িত্ব পুরুষের স্বার্থের সহায়ক এবং নারী স্বার্থের পরিপন্থি। নারীর বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয় তার পরিবার থেকেই অতি নিকট আপনজন দ্বারা। মেয়ে শিশুর জন্মলগ্ন থেকে বৈষম্য শুরু হয়। ছেলেজন্ম নিলে আজান দেয় আর মেয়ে শিশু জন্ম নিলে আজান দেয় না। এটা একটা নেতিবাচক দিক। পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ নারীকে অধস্তনতায় নিপতিত করে। আর সে অধস্তনতাকে স্থায়ী করার জন্য পুনরায় অধস্তনতার প্রাতিষ্ঠানিক কারণ করে থাকে।

নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণযাত্রা কাছের লোকজনদের থেকে শুরু হয়। পিতৃভূমিকায় উত্তীর্ণ বাবা সবসময় মেয়েদের শিক্ষা, আচরণ, জীবনযাপনের ধরনাক নির্দিষ্ট এ নিয়ন্ত্রিত করে দেয়। অন্যদিকে, মাতা ও পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী মেয়েকে সমাজের সনাতনী মেয়েলি আদর্শ এবং নারীসুলভ আচরণ শেখায়। তাছাড়াও বাংলাদেশের নারীর নিম্নমর্যাদার কারণ হিসেবে বিবাহ প্রথা, বৈবাহিক সম্পর্ক ও মাতৃত্বকেও দায়ী করা যায়। পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী নারীকে বিয়ের পর ছাড়তে হয় তার বাবার বাড়ি। আত্মীয়স্বজন এটা নারীদের মানসিক দুর্বলতা ও ক্ষমতাহীনতাকে বাড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও পারিবারিক নিয়মকানুন দ্বারা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত বিবাহপ্রথা, বৈবাহিক সম্পর্ক, মাতৃত্ব ইত্যাদি পরিচালিত হয়। অধিকাংশ মেয়ের বিয়েতে তার মতামত গ্রহণ করা হয় না।

উপসংহার: বিভিন্ন কারণে সমাজে নারীরা সংখ্যালঘু অবস্থানে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে নারীরা শহর এলাকায় বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে এতে নারীদের কিছুটা ক্ষমতায়ন হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসমূহ মুল্যায়ন কর

বাংলাদেশে প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসমূহ 

ভূমিকা: মানবসভ্যতা ক্রমান্বয়ে যন্ত্রনির্ভর, কর্মমুখী, ব্যস্ত ও জটিল হয়ে পড়ছে। ফলে নির্ভরশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠী অধিকমাত্রায় অসহায় হয়ে পড়ছে। বার্ধক্যে নারীদের অবস্থা আরও করুণ হচ্ছে। বার্ধক্য বর্তমানে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। প্রবীণ নারীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ

প্রবীণ নারীদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ

বর্ষীয়ানদের জন্য বিবিধ সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে নানারকম কর্মসূচির গরিকল্পনা ও প্রয়োগ পরিচালিত হয়। এই সমস্ত কর্মসূচির মধ্যে কতকগুলো সরকারি ও বেসরকারি। এই পরিকল্পনার উদেশ্য হলো বয়স্ক জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও জৈবিক, মানসিক, অর্থনীতিক এবং সামাজিক সমস্যাসমূহের সমাধান। এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত সাহায্য-পরিকল্পনাগুলো (১) দিবা পরিচর্যা কেন্দ্র (২) চিকিৎসা পরিষেবা (৩) বৃদ্ধাবাস (৪) অ-প্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা।

১. দিবা পরিচর্যা কেন্দ্র:

পরিবারের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে এই কেন্দ্রগুলো পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিবর্গের দায়ভার বহন করে থাকে। এখানে বয়স্ক মানুষের পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়। শহর, আধা-শহর, গ্রাম এবং আদিবাসী এলাকায় এই সমস্ত কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

২. চিকিৎসা পরিষেবা:

চিকিৎসা পরিষেবার উদ্দেশ্য হলো শহর, গ্রাম ও বিস্তীর্ণ বস্তিবাসীদের এলাকার উন্নতমানের চিকিৎসা পরিষেবার সহায়তা সুলভে সহজলভ্য করা। যে সমস্ত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ চিকিৎসা পরিষেবার সামর্থ্য আছে, তাদের মাধ্যমে বর্ষীয়ানদের জন্য এরকম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

৩. বৃদ্ধাবাস:

বার্ধক্য সমস্যার মোকাবিলায় বৃদ্ধাবাস প্রকল্প হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এই সমস্ত বৃদ্ধাবাসে সাধারণত নিম্ন আয়ের ও নিম্ন মধ্যম আয়ের বৃদ্ধদের আবাসিক হিসেবে নেওয়া হয়ে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষ সম্পূর্ণ সরকারি সাহায্য বা সেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে পরিচলিত বৃদ্ধাবাসে নির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে বর্ষীয়ানরা আবাসিক হিসেবে বসবাস করেন। এই সমস্ত বৃদ্ধাবাসে বর্ষীয়ান ব্যক্তিদের শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থসামাজির পরিষেবার ব্যবস্থা করেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, মনোবিদ ও সমাজকর্মী।

৪. অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা:

অপ্রাতিষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত পরিষেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে সমাজকর্মী নিয়োগ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সমাজকর্মীদের মাধ্যামে বর্ষীয়ান নানারকম অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ ধরনের পরিষেবা প্রদানের উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন আইনি পরামর্শ প্রদান, আয়কর বিষয়ক পরামর্শ প্রদান, অবসরকালীন ভাতা বিষয়ক পরামর্শ প্রদান ব্যবস্থা বলা হয়।

৫. অন্যান্য সরকারি পদক্ষেপ:

অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্য নিম্নের বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।

(ক) বর্ষীয়ান নাগরিকদের আয়কর ছাড়ের ব্যবস্থা।

(খ) বর্ষীয়ান নাগরিকদের রেলের যাতায়াত ব্যবস্থার উপর ছাড়ের ব্যবস্থা।

(গ) দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থিত ৬৫ বছরের উধ্বসীমার জন্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে মাসে চাল বা গম বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

(ঘ) বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা প্রাকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা।

বার্ধক্যের সমস্যা সমাধানে বার্ধ্যবিদ সমাজবিজ্ঞানীদের পদক্ষেপ

বার্ধক্যবিদ সমাজবিজ্ঞানীরা বার্ধক্যের সমস্যাদির সম্যক ও সার্থক মোকাবিলার ব্যাপারে কতকগুলো বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে সুপারিশ করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট সুপারিশসমূহের মধ্যে কতকগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সমস্ত সুপারিশমূলক পদক্ষেপের কতকগুলো ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণের কথা বলা হয়।

১. বার্ধক্য সহায়তা প্রকল্পসমূহ প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম। এক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।

২. বার্ধক্যের সমস্যাদির মোকাবিলায় তাদের জীবনধারার মান, পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আছে।

৩. বার্ধক্য, সহায়তা প্রকল্পসমূহের সরকারকে অধিকতর ব্যয়ভার বহন করতে হবে। প্রকল্প প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থা সাম্পর্কে সবরকম খবরা-খবর নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।।

৪. সামাজিক গুরুত্ব প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক ব্যক্তিদের অবসর, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতাকে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. বয়স্ক ব্যক্তিদের কিছুটা আর্থিক স্বনির্ভর সৃষ্টির লক্ষ্যে আংশিক সময়ের জন্য অর্থকরী কাজে কর্মে নিয়োগের ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়।

৬. চিকিৎসাবিদ এবং অন্যান্য বৃত্তিমূলক পাঠ্যক্রমে বার্থক্যবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। বার্ধক্যবিদ্যার পঠন-পাঠন ও চর্চা গুরুত্বসহকারে হওয়া দরকার।

৭. বয়স্ক ব্যক্তিদের পরিষেবার কাজে নিযুক্ত কর্মীদের প্রয়োজনমতো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। তাছাড়া বার্ধক্যপীড়িত মানুষজনের সম্যক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও পৃথক পরিষেবার ব্যবস্থা থাকা দরকার।

৮. সচেতনতামূলক সকল কর্মসূচিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিসমূহের প্রয়োজনীয় বিকেন্দ্রীকরণ বাঞ্ছনীয়।

৯ সাবেকি যৌথ পরিবায়সমূহকে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতা ছিল। সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধসমূহকে পুনঃসামাজিকীকরণ এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে করা প্রয়োজন।

১০. বর্ষীয়ানদের সহায়তাদান কর্মসূচি আর্থসামাজিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরিপেক্ষিতে ভারসাম্যভাবে প্রশস্ত করতে হবে।

১১. উন্নত দেশসমূহের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বার্ধক্য পরিষেবার ক্ষেত্রে স্বোচ্ছাসেবী সংস্থাসমূহের সঙ্গে শিক্ষিত প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোকে মুনাফালোভী মানসিকতা ছাড়তে হবে।

বার্ধক্যের সমস্যাদি সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পদক্ষেপ

বার্ধক্যের সমস্যা সমাধনের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এ সমস্ত পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

(ক) বার্ধক্যজনিত শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে যথাসম্ভব হ্রাস করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কতকগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দরকার।

এই স্বাস্থ্যবিধিগুলো হলো নিয়মিত জীবনপ্রণালি, পরিমিত শরীর চর্চা, নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রভৃতি। বর্ষীয়ান মানুষদের মানসিকভাবে সুস্থ থাকার এবং মানসিক চাপ হ্রাসের উপায়/পদ্ধতিসমূহ আয়ত্ত করাতে হবে।

(খ) বয়স্ক মানুষদের অবসর সময়েই সঠিক ব্যবহারের ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ অর্থকরী শখ অনুসরণ করা, শাক-সবজি বা ফুলের বাগানে কাজ করা, অন্যান্য হালকা কাজকর্মের শামিল হওয়া প্রভৃতি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

(গ) বিবিধ স্বোচ্ছামূলক সেবাপ্রদান প্রকল্পসমূহের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্তদের সংযুক্ত হতে হবে।

(ঘ) বর্ষীয়ানদের প্রতি সেবাদানের মানসিকতা, মূল্যবোধ পরিবারের সকলের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।

(ঙ) বার্ধক্য, পরনির্ভরতাকে যথার্থ ও সুনিশ্চিত করার অন্য কর্মজীবনে অর্থ সঞ্চয়ের অভ্যাস আয়্তে করতে হবে।

(চ) প্রতিকূল পরিস্থিতি ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করার মানসিকতা ও অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

(ছ) ভারসাম্যহীনতা ও একাকিত্ববোধ আটকানো দরকার। তার জন্য প্রয়োজন হলো সামাজিক কাজকর্মে শামিল হওয়া, সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত প্রভৃতি।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রবীণ নারীদের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসমূহ সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমানে এর কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবুও আধুনিকায়নের কল্যাণে প্রবীণ মারীদের ঘরে বসেই সেবাদান প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে NGO-র ভূমিকা পর্যালোচনা করা

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীর ক্ষমতায়নে এনজিও-র ভূমিকা

ভূমিকা: বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি খুবই অনুন্নত। এই গ্রামীণ সমাজের নারীরা খুবই অনুন্নত। এই গ্রামীণ সমাজে নারীরা খুবই অসহায়। তারা সম্পূর্ণরূপে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এর মূল কারণ নারীর অর্থনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করতে না পারা। তবে আশার কথা এটুকু যে, গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে এদেশের এনজিও গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

নারীর ক্ষমতায়নে NGO-র ভূমিকা

নারীর ক্ষমতায়নে এনজিও-র ভূমিকা:

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারীকে বাদ দিয়ে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব নয়। উপরন্ত নারীরা বঞ্চিত হলে উন্নয়নের ধাপকে পেছন দিকে নিয়ে যায়। এনজিও-গুলোর নারী উন্নয়নের কাজের ফলে বাংলাদেশের বঞ্চিত-অবহেলিত নারী সমাজ সংগঠিত হতে শিখেছে। এনজিওদের নারী উন্নয়নের কাজের ফলে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সহায়কশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। নিম্নে নারীর উন্নয়নে এনজিও ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. নারী শিক্ষা:

শিক্ষা এনজিও কার্যক্রমের একটি বিশেষ দিক। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ দুঃখের বিষয় হলো গ্রামীণ সমাজের নারীরা এই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ এই শিক্ষার সুযোগ যনি দরিদ্র নারীদের কাছে পৌছে দেওয়া যেত তাহলে তারা পুরুষের পাশাপাশি সমাজে ভূমিকা পালন করতে পারতে। এই নারীশিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। তারা গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে।

২. নারীদের ঋণ ও সঞ্চয় প্রদান:

এনজিওসমূহ গ্রামীণ এলাকায় লোকজনের মধ্যে ঋণ প্রদান করে এবং সঞ্চয়ে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে এনজিওসমূহ নারীদের ঋণ প্রদান করে থাকে। প্রথম এরা গ্রামীণ নারীদের নিয়ে সমিতি গঠন করে। সমিতির সদস্যরা নিজেরা মাসিক ও সাপ্তাহিক সত্য করে সিদ্ধান্ত নেয়। সমিতির নায়ী সদস্য সমিতির মাধ্যমে এনজিওগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে এবং এই ঋণের টাকা দিয়ে তারা ধান কেনে, গরু কেনে এবং নিজেরা স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করে।

৩. দারিদ্র্য বিমোচন:

গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য বিমোচনে এনজিওসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা সহজ শর্তে নারীদের ঋণ প্রদান করছে। অথচ গ্রামীণ নারীর ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ পায় না। কারণ তারা জামানতের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে না। এনজিওসমূহের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে এরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করছে। বাড়িতে সবজির বাগান করছে। এর ফলে তাদের মধ্যে সচ্ছলতা আসছে। তারা বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারছে।

৪. প্রশিক্ষণ প্রদান:

এনজিওসমূহ নারীদের বিভিন্ন কাজকর্মের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে নারীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ হাঁস-স্বরণি ও মৎস্য চাষের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। নারীরা এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিভিন্ন কুঠিরশিল্পজাত দ্রব্য তৈরি করে পরিবারের আর্থিক সাহলভা বৃদ্ধিতে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছে। একসময় ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল নারীদের জন্য অপরাধ। বর্তমানে এনজিও ও নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে নারীরা এখন বাড়ির বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে।

৫. নারীস্বাস্থ্য উন্নয়ন:

'সবার জন্য স্বাস্থ্য' এই ঘোষণা থাকলেও গ্রামীণ অধিকাংশ নারীরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া গ্রামীণ নারীদের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় কারণে তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারছে না। তারা নানবিধ অসুখ নিয়েই জীবনযাপন করছে। নারীদের এই অবস্থার উন্নয়নকল্পে এনজিওসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। এনজিওগুলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসহ স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনমত তৈরিতে সহায়তা করছে। প্রসূতি মৃত্যুরোধ, টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ হ্রাসে এনজিও-গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

৬. নারী নির্যাতন রোধ এবং নারী অধিকার আদায়:

নারীদের অধিকার আদায় ও স্বার্থ সংরক্ষণে এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এনজিও বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়াও দরিদ্র নারীদের অধিকার রক্ষায় তারা আইনগত সহায়তা প্রদান করে চলছে। এজন্য এনজিওসমূহ তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

৭. নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি:

এনজিওগুলো গ্রাম এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সেখানে গ্রামীণ নারীদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করছে। গ্রামীণ নারীরা প্রকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া এনজিওগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। এতে তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।

৮. নারীদের সচেতনতা সৃষ্টি:

গ্রামীণ নারীদের সচেনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। সচেতনতার অভাবে তারা তাদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যবিধি, আইনি সহায়তা, আর্থিক সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্পর্কে অবগত থাকে না। এনজিওসমূহ নিয়মিত উঠান বৈঠক, আলোচনা সভা, প্রচারপত্র বিতরণ, নাটিকা, ভিডিও প্রদর্শনী এবং নারী সমাবেশের মাধ্যমে তাদের সচেতন করে তুলছে। ফলে নারীরা নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে এবং পরিবার ও সমাজে নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। নারীদের অধিকার ও সচেনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলো বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন করছে।

৯. নারী স্বাধীনতা সৃষ্টি:

নারী স্বাধীনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।গ্রামীণ নারীরা একসময় পরিবারের কাজে সীমাবদ্ধ ছিল; অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক কুসংস্কার ও পুুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারত না। এনজিওগুলো নারীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ঋণ, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড, সঞ্চয় এবং আইনি সহায়তার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলছে। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীদের স্বাধীনতার প্রধান ভিত্তি। নারীরা যখন নিজে আয় করতে পারছে, তখন তারা সংসারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারছে। এনজিওর কর্মকাণ্ডে নারীরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। এতে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেড়েছে এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

১০. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ:

অনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এনজিচসমূহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এক সময় নারীরা স্বামীর ইচ্ছার বাইরে ফোনো কাজ করতে পারত না। এই এনজিওগুলো জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানে ব্যাপকভাবে পরিবার-পরিকল্পনা কর্মসূচিকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। তারা বিনামূল্যে এবং স্বল্পমূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ করছে।

১১. তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ:

ডিজিটাল যুগে নারীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এনজিওগুলো গ্রামীণ নারীদের তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল সেবা, স্মার্টফোন ব্যবহার এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করছে। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, সেলাই-পণ্য বিক্রি ইত্যাদির মাধ্যমে নারীরা ঘরে বসেই আয় করতে পারছে।

১২. আইনি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান:

নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা ইত্যাদি সমস্যায় এনজিওগুলো সরাসরি আইনি সহায়তা প্রদান করছে। তারা আইনজ্ঞ নিয়োগ, হটলাইন পরিচালনা, পুলিশ-প্রশাসনের সাথে সমন্বয়, আইনি সচেতনতা ক্যাম্পেইন, নারী অধিকার বিষয়ক আলোচনা ইত্যাদি পরিচালনা করে থাকে। এতে নারীরা ন্যায্য অধিকার পেতে সক্ষম হয় এবং সমাজে আইনি নিরাপত্তাবোধ বাড়ে।

১৩. পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে নারীদের সম্পৃক্তকরণ:

এনজিওগুলো গ্রামীণ নারীদের পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, জ্বালানি সাশ্রয়, নিরাপদ পানির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় নারীদের সাইক্লোন শেল্টার ব্যবহারে প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি, লবণাক্ততা মোকাবিলা, বিকল্প জীবিকা ইত্যাদি বিষয়ে সহায়তা দিচ্ছে। ফলে নারীরা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সক্ষম হচ্ছে।

১৪. সামাজিক কুসংস্কার ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ:

গ্রামীণ সমাজে বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা নারীর উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। এনজিওগুলো এসব বিষয় মোকাবিলায় সচেতনতা কর্মসূচি, নাটক, ক্যাম্পেইন, যুব ক্লাব গঠন, কমিউনিটি ডায়ালগ এবং ধর্মীয় নেতাদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। ফলে কুসংস্কার কমছে, নারীরা দ্রুত বিয়ে থেকে রক্ষা পাচ্ছে এবং শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়ছে।

১৫. নারী নেতৃত্ব বিকাশ:

গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এনজিওগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তারা গ্রাম পর্যায়ে নারী নেত্রী তৈরি করার জন্য কমিটি গঠন, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, দলনেত্রী নিয়োগ, গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে নারীদের নেতৃত্বের অভ্যাস তৈরি করছে। ফলে নারীরা সামাজিক উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যা সমাধান এবং দল পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, এনজিওগুলো গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্নমুখী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই কার্যক্রম নারীদের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। তাই নারীর ক্ষমতায়নে এনজিও-র ভূমিকা অপরিসীম।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আলোচনা কর

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

ভূমিকা: বর্তমান সামাজিক অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিকসহ সফল ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারী নিম্নস্তরে অবস্থান করছে। অথ পুরুষের তুলনায় নারীর অবদান সমাজগঠনের ক্ষেত্রে কোনো অংশে কম নয়। সমাজের সার্বিক উন্নয়নে পুরুষের সাথে সাথে নারীর অংশগ্রহণ কোনো অংশে কম নয় কিন্তু নারীর অবদানকে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কখনো স্বীকার করা ময়নি। বরং নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে নারীদের অধস্তন করে রাখার জন্য।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

স্বাধীনতার পর ৭২ সালের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও প্রতিফলিত হয়েছে নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টি। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮):

এই পরিকল্পনার আওতায় ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ছিন্নমূল নারীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ও তাদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং চাকরি প্রদান করা।

২. দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৮-৮০):

বিবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

৩. দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৮০-৮৫):

এ পরিকল্পনার আওতায় ছিল- (ক) জাতীয় উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া।

(খ) দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নারীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।

(গ) উপার্জনমূলক কাজে নারীদের অংশগ্রহণ করানো।

৪. তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৮৫-৯০):

এ পরিকল্পনার আওতায় ছিল- (ক) সরকারি চাকরিতে নারীর কোঠা ১০% থেকে ১৫%-এ উন্নীত করা।

(খ) নারীর স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ।।

৫. চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৯০-৯৫):

এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল- (ক) সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী-পুরুষের সমানাধিকার।

(খ) নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণ।

(খ) নারী- নির্যাতন বন্ধ করা।

৬. পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৯৭-২০০০)

এই পরিকল্পনায় নারীকে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে জেন্ডার বৈষম্য কমিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এতে ব্যাটিক ও সামষ্টিক উড়য় ক্ষেত্রেই নারী উন্নয়ন নীতিমালার লক্ষ্যসমূহ সন্নিবেশিত হয়।

৭. পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার (১৯৯৫-২০১০):

এ পর্যন্ত ১৫ বছরের জন্য নিম্নোক্ত কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল- (ক) নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি।

(খ) নারী উন্নয়নে NGO-গুলোর কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করা।

(গ) CEDAW-এর প্রতিপূর্ণ সমর্থন দান।

৮. আইনি পদক্ষেপ:

বাংলাদেশ সরকার নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন রোষে প্রচলিত আইনের সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এসব আইনের মধ্যে রয়েছে-

(ক) মুসলিম পারিবারিক আইন (১৯৬৯)।

(খ) যৌতুকবিরোধী আইন (১৯৮০)।

(গ) বাল্যবিবাহ রোধ আইন (১৯৭৪)।

(ঘ) পারিবারিক আদালত আদেশ (১৯৮২)।

(ঙ) নারী ও শিশু নির্যাতন আইন (১৯৮৩)।

নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে সুপারিশমালা

১. প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিকৃতি:

নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে নারীবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটাতে হবে।

২. সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন:

নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে।।

৩. জাতীয় মহিলা উন্নয়ন পরিষদের ভূমিকা:

এ পরিষদের মাধ্যমে নারীদের আইনগত অধিকারের বাস্তবায়ন ও নারী উন্ননে এবং নারীনির্যাতন প্রতিরোধসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

৪. NGO সহযোগিতা:

সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নায়ী উন্নয়নে ও নারী ক্ষমতায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

৫. তৃণমূল পর্যায়ে সহযোগিতা:

তৃণমূল পর্যায় অর্থাৎ গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী উন্নয়নে সকল প্রকার সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ।

৬. ভোটাধিকার:

ভোটাধিকার প্রদানের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়।

৭. স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ:

১৯৯৭ সালের অধ্যাদেশে নারীদের স্থানীয় নির্বাচনে তিনটি আসনে নির্বাচন করার ক্ষমতা দেয়া হয়। আর স্থানীয় সরকারের সফল স্বরসহ সরকার ও প্রশাসনে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকার যেসব পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক কিন্তু তারপরও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হয়, যাচ্ছে না। তার একমাত্র কারণ শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করা বাস্তবায়ন করা হয় না। তাই এসব পদক্ষেপ যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে।