বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদ কী? উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ কর

 বর্ণবাদ কী? বর্ণবৈষম্যবাদ বলতে কী বুঝ?

ভূমিকা: মানুষের যে ধারা, পার্থক্য ও সংস্কৃতিগত বৈষম্যের মূলে দৈহিক বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হলো বর্ণবৈষম্যবাদ। অন্যভাবে বলা যায়, বর্ণবৈষম্যবাদ বলতে মানুষের জৈবিক বা দৈহিক কারণে কাউকে ছোট বা বড় অথবা কাউকে যোগ্য আর কাউকে অযোগ্য, কাউকে মর্যাদাবান, আর কাউকে অমর্যাদাবান বলে মনে করা হয়।

বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদ কী? উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ কর

বর্ণবাদ/বর্ণবৈষম্যবাদ: Philif Kattak তাঁর 'Anthropology গ্রন্থের Glossary-তে বলেন, জৈবিক কারণে কোনো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যই হলো বর্ণবৈষম্য। মূলত উনবিংশ শতাব্দীতে মানব ইতিহাসে বর্ণবাদী ব্যাখ্যা প্রমান করা হয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ককেশীয় নরগোষ্ঠীই উচ্চ ও উৎকৃষ্ট নৃগোষ্ঠী। বাদবাকি সবাই নীচ ও নিকৃষ্ট। বর্ণবাদীদের মতে, সভ্যতা উৎকৃষ্ট নৃগোষ্ঠীই বেশি অবদান রেখেছে। কারণ তারা জৈবিক ও দৈহিক দিক থেকে উন্নত। অন্যদিকে, নিকৃষ্টরা দৈহিক দিক থেকে অনুন্নত এবং সভ্যতায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যকে দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়-

১. ব্যক্তিগত পর্যায়: ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধারণা হলো কতিপয় বর্ণগোষ্ঠী প্রকৃতভাগেই আগামী এবং অপররা পশ্চাদগামী। এ পর্যায়ে ২টি সমসাময়িক বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে।

২. প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়: এ পর্যায়ে এটি এক ধরনের বৈষম্য নীতি এবং তার অনুশীলনের সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে বিভিন্ন বর্ণগোষ্ঠী সদস্যদের মধ্যে অসমতা সূচিত হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, বর্ণবৈষম্যবাদ বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে টিকে না। ফলে এটি ভ্রান্ত বলে পরিত্যক্ত হয়েছে। আধুনিক নৃবিজ্ঞানীদের মতে, সংস্কৃতি নৃগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষতাবে কাজ করে


Race এবং Ethnicity বা  উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ কর।

আমরা বিভিন্ন দেশে এথনিক কিংবা উপজাতিদের বসবাস দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি, যার সদস্যরা একে অপরের সাথে অভিন্ন কোনো সৃষ্টি ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত।

Ethnicity এবং Race বা  উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মধ্যে পার্থক্য: নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতি সম্প্রদায় উভয়ই মানব সম্প্রদায়। তথাপি উভয়ের মধ্যে কতিপয় পার্থক্য লক্ষ করা যায়। নিম্নে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতির মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো-

১. যেসব জনগোষ্ঠী প্রাচীন কাল থেকে তাদের পূর্ব সমাজের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আসছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে তাদেরকে উপজাতি বলে। অন্যদিকে, নৃগোষ্ঠী বলতে মানব প্রজাতির এমন এক উপবিভাগকে বোঝায়, যারা কতকগুলো ভিন্ন ভিন্ন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে।

২. উপজাতিদের দৈহিক ধরন গোত্রভেদে এক না, কিন্তু নরগোষ্ঠীর দৈহিক ধরন প্রায়ই একই রকম। 

৩. উপজাতিরা সাধারণত পাহাড়িয়া এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বাসস্থান স্থাপন করে। অপরদিকে, মানবগোষ্ঠী সমতল ভূমিতে যান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করে।

৪. উপজাতিদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রাচীদকে আঁকড়ে ধরে রাখে। কিন্তু নৃগোষ্ঠী আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যায়।

৫. উপজাতিদের বিভাজন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে করা যায় না। কিন্তু নরগোষ্ঠীর বিভাজন দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে করা যায়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষের দৈহিক আকার-আকৃতির উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা সুস্পষ্ট যে, ১১টি নৃগোষ্ঠী পরস্পরের সংমিশ্রণে আরো নতুন নৃগোষ্ঠীর বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। অর্থাৎ, এসব নৃগোষ্ঠীর জিন পরিবাহিত হয়ে নতুন নতুন নৃগোষ্ঠীর উদ্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া নৃগোষ্ঠীর রয়েছে আধুনিক ও ভৌগোলিক শ্রেণিবিভাজন।

জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক কী?

জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আলোচনা কর

ভূমিকা: স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক মর্যাদা ছিল কিংবা উদ্ধার করতে চায় তাদেরকে বলা হয় জাতীয়তা। আর জাতীয়তা যাদের মধ্যে বিরাজ করে তখন একটি আদর্শ বিরাজ করে আর এই আদর্শই মূলত জাতীয়তাবাদ।

জাতীয়তাবাদ কী? এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক কী?

জাতীয়তাবাদ: জাতীয়তাবাদ হচ্ছে একটি আধুনিক ধারণা। এটি একটি আদর্শ (ideology) বা একাত্মবোধের নাম। আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল জাতিরাষ্ট্র জাতীয়তাবাদী চেতনা দ্বারা পরিচিত যয়ে থাকে। একটি রাষ্ট্রে এমন কিছু সাধারণ কৃষ্টি, সংস্কৃতি বা অনুসরণীয় বিষয় থাকে যাকে আশ্রয় করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ, দেশপ্রেম ইত্যাদি সুদৃঢ় হয়।

Prof. Zimmern-এর মতে, "কোনো নির্দিষ্ট আবাস ভূমির সাথে সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধভাবে বিশেষ অজরই গুরুত্বপূর্ণ এক মর্যাদাযুক্ত অনুভূতির প্রকাশই হলো জাতীয়তাবাদ।"

হ্যাশ কোন-এর মতে, জাতীয়তা হলো প্রথম এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের এক মানসিক অবস্থা ও এক ধরনের সচেতনতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হায়েস এর মতে, 'একটি জাতীয় জনসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সার্বভৌম স্বাধীনতা অর্জন করে জাতীয়তা সৃষ্টি করে। এটা চিরকাল স্থায়ী থাকে না। সময়ের বিষর্তনের হারিয়ে যায়।।

বর্তমানে মানুষ রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণভা আইনগত অধিকার ইত্যাদি লাভের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বা ভূখণ্ডে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই যে তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করে তা দ্বারা জাতীয়তা পুরোপুরি সার্থকতা অর্জন করে। আর এই জাতীয়তায় আদর্শ হলো জাতীয়তাবাদ।


এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক

ভূমিকা: আমরা বিভিন্ন দেশে এথনিক কিংবা উপজাতিদের বসবাস দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন কিছু জনসংখ্যার সমষ্টি, যার সদস্যরা একে অপরের সাথে অভিন্ন কোনো সৃষ্টি ঐতিহ্যের কারণে পরিচিত।

এথনিক গ্রুপের সাথে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা নানা জাতিগোষ্ঠী ও এথনিক বা নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখতে পাই। এথনিক গ্রুপ বলতে বোঝায় এমন একটি জনসংখ্যার সমষ্টিকে, যারা অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম কিংবা বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে চিহ্নিত করে। তারা সাধারণত একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে, যা তাদের একত্রিত করে।

একসময় "জাতি" শব্দটি মূলত গোষ্ঠী, গোত্র বা এথনিক গ্রুপ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তবে আধুনিক কালে জাতির ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন জাতি বলতে বোঝানো হয় এমন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একককে, যার রয়েছে নিজস্ব ভূখণ্ড, কেন্দ্রীয় সরকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় কাঠামো। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র এবং জাতি প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সত্তা একীভূত হয়, তখনই তা একটি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স বা জাপান।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ রাষ্ট্রে একটি একক এথনিক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ ও অভিবাসনের ফলে অধিকাংশ দেশেই বহু জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ১৯৭২ সালে কনর (Connor) দেখিয়েছেন, ১৩২টি জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ১২টিতে (প্রায় ৯%) সাংগঠনিক নৃগোষ্ঠীগত ঐক্য ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে নেলসন (Nelsson) গবেষণা করে দেখান, ১৬৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৪৫টি রাষ্ট্রে একটি একক এথনিক গোষ্ঠী ৯৫% জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।

এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে জনগণকে একত্রিত করা সম্ভব। অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তি হতে পারে বংশগত পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, আত্মীয়তার বন্ধন কিংবা শারীরিক বৈশিষ্ট্য। এথনিক গোষ্ঠীগুলোকে উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় মূলধারায় সম্পৃক্ত করলে একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি গঠন করা সম্ভব।

উপসংহার: পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূলভিত্তি হতে পারে পূর্বপুরুষ পরিচয়ভিত্তিক বংশগত পরিচয়, ইতিহাস, আত্মীয়তার বন্ধন, ধর্ম, ভাষা, অভিন্ন সীমানা, জাতীয়তা অথবা অভিন্ন কোনো শারীরিক গঠন। আতীয় বৈশিষ্ট। উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে এথনিক গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, এথনিক গোষ্ঠীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

অথবা, আদিবাসী সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা: বাংলাদেশে নানারকম উপজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে। আর এসব উপজাতি সম্প্রদায়ের এদেশে আবির্ভাব ঘটেছে একেক সময়ে। এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে আগমন করেছে। এদেশে ৩০ টির মতো উপজাতি বসবাস করছে।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলাদেশে এথনিক গোষ্ঠীর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ 

নিম্নে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

১. চাকমা: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমা উপজাতিরা বসবাস করে। এদের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০,০০০ হাজার। চাকমা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি সম্পর্কে কর্নেল ফায়ার ভাঁর History of Barma গ্রন্থে বলেন, চাকমারা ব্রহ্মদেশ থেকে ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে আগমন করেছে। নৃবিজ্ঞানী স্যার রিজলি এ ব্যাপারে বলেছেন, ব্রহ্ম ভাষায় 'সার্ক' বা 'সেক' জাতি থেতে চাকমাদের উদ্ভব। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী শহরের নিকটবর্তী এলাকায় 'সার্ক' বা 'সেফ' জাতি এক সময় খুব শক্তিশালী ছিল। মগদের মতে, চাকমারা মুঘল বংশধর। চাকমাদের উৎপত্তি সম্পর্কে তারা বলেন, তারা শাক্য বংশোদ্ভূত মধ্যমুদি বুদ্ধের বংশধর।

২. মণিপুরি: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সিলেট এবং মৌলভীবাজার অঞ্চলে মণিপুরি উপজাতিরা বসবাস করে। এদের সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০। এদের আদিনিবাস ভারতের পূর্বাঞ্চল মণিপুরে। ব্রহ্মবাসীদের চাপে পড়ে উনবিংশ শতাব্দীর ক্যোনা এক সময়ে মণিপুরি এক রাজপুত্র সিলেট পালিয়ে আসে এবং ঐ রাজপুত্রই মণিপুরিদের পূর্বপুরুষ হিসেনে বিবেচিত।

৩. মগ: আরাকানে মাগদের আদিনিবাস। এরা বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় বসবাস করে। প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এরা বর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হলে আরাকান থেকে পালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে।

৪. খাসিয়া: বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে খাসিয়ারা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানী বেভারেজ এইচ রবার্টন ও মি. স্যাড ওয়েল-এর মতে, খাসিয়াদের আদিনিবাস ব্রহ্মদেশ এবং পরবর্তীতে তারা আসামে এসে বসতি স্থাপন করে। অন্যদিকে, নৃবিজ্ঞানী ড. গিয়ারসন খাসিয়াদের ভাষা বিশ্লেষণ করে জানতে পারেন যে, তারা চীনের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন।

৫. রাখাইন: প্রায় দুইশত বছর পূর্বে রাখাইনরা আরাকান থেকে এসে এদেশে বসবাস শুরু করে। ঐতিহাসিক পক্ষোপটে জানা যায় যে, অষ্টাদশ শতকের শেষার্থে পটুয়াখালী অঞ্চলে এবা বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, রামু, টেকনাফ ও পটুয়াখালীতে রাখাইন উপজাতি বসবাস করে।

৬. সাঁওতাল: সাঁওতাল হাচ্ছে ভারত মহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী। সাঁওতালদের উৎপত্তি সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টার বলেছেন, সাঁওতালরা পূর্বদিক থেকে বাংলাদেশে এসেছে এবং পরে পশ্চিমদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৭. হাজং: বাংলাদেশের ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের সমতল এলাকা ও সুনামগঞ্জে হাজংরা বসবাস করে। এয়া ভারতের মেঘালয়সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করেছে।

৮. মুরং: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেরই আদিবাসী হিসেবে মুররো দাবি করে। অন্যদের মতে, কুকিল্লীম জামা চট্টগ্রামে চালু হওয়ার আগেই মুরংরা এ অঞ্চলে বাস করতো।

৯. গারো: বাংলাদেশের ময়াজনসিংহ জেলায় গারোরা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন গারোরা এ অঞ্চলের নায়। স্যার বিজলির মতে, গায়োদের আধিনিবাস ছিল আসাম প্রদেশে। অন্যদের মতে, দুর্ভিক্ষের কারণে চীন দেশ থেকে ভারতে আসায় এদেশে যেখানে গারো পাহাড় অবস্থিত, সেখানে এরা এসে বসবাস শুরু করে। ১০. রাজবংশী: রাজবংশীরা নিজেদের রাজবংশী হলে পরিচয় দেয়। এয়া বর্তমানে ডাদের সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়ে মুসলমান ও হিন্দুদের সাথে মিশে গেছে।

১১. বাম: আরাকানে বাম উপজাতিদের আদিনিবাস। পেশাগত দিক থেকে এরা সবাই যাবসায়ী।

১২. কুকি: বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় কুকিরা বসবাস করে। কুকিদের আদিনিবাস রাঙামাটি জেলায়।

১৩. তঞ্চ্যঙ্গা: তঞ্চ্যঙ্গা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেক উপজাতির নাম। এরা সংখ্যায় প্রায় ১২,০০০ জন। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে এরা চাকমার উপজাতিদের একটি শাখা। এরা নিজেদের ভাষাকে আজও জীবিত রাখতে পেরেছে।

১৪. কুমি: এদেশে আরাকানের কুমি উপজাতিরা আগমন করেছে। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে।।

১৫. মিজো: ভারতের মিজোরাম ও ব্রহ্মদ্যেশ মিজো আদিবাসীদের আদিনিবাস। এরা অতীতে এক সময় কর্ণফুলী নদীর তীরে রাজত্ব করতো।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উপজাতিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন সময় বংলাদেশে এসেছে এবং বসবাস করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো এথনিক গোষ্ঠী।

এথনিক অভিযোজন কী? নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি আলোচনা কর

এথনিক অভিযোজনের ধারণা দাও। নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক

ভূমিকা: এথনিক গ্রুপ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে, যা অন্যদের থেকে ভিন্ন। এরা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিসীমায় নিজস্ব গোত্রীয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা নিয়ে বসবাস করে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে তদের যে সামাজিক দূরুত্ব রয়েছে তা কমানোর জন্য অভিযোজন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়।

এথনিক অভিযোজন কী? নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি আলোচনা কর

এথনিক অভিযোজন: সমগ্র বিশ্বে নৃগোষ্ঠীগত, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিগত কারণে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা হয়। আর এ বৈচিত্র্যই সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শপূর্ণ বিয়োগ থাকলেও তাদের মধ্যে ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়ার পথ সুগম করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্য বন্ধুত্বপূর্ণ সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সর্বদা চেষ্টা করছে। সংখ্যালঘুদের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। নিম্নে বাংলাদেশের সংখ্যালয় সম্প্রদায়ের অভিযোজন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হলো।

১. ভাষাগত সমন্বয় সাধন: প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে কথোপথনক্যাল তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের অন্যান্য মানুষ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলাকালে বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে অভিযোজন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

২. সামাজিক ঐক্য সাধন: সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক সমন্বয় সাধনের জন্য নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রচলিত সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বকীয় অংশগ্রহণ করে।

৩. চেতনা সৃষ্টি: সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সাধারণ জনগণের সাথে একত্রে পাশাপাশি বসবাস, চলাফেরা করার ফলে খুব সহজেই একেক অন্যকে জানতে পারে। একে অন্যের সাথে নানাভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহনের ফলে অভিযোজন প্রক্রিয়া দ্রুত বাড়ছে।

৪. ধর্মীয় অবস্থান: প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্ম রয়েছে, যা তারা অতি আগ্রহ, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে পালন করে থাকে। অভিযোজন প্রক্রিয়ার ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পাশাপাশি তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে থাকে।

৫. শিক্ষা: সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দিন দিন আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের অভিযোজন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। শিক্ষা অর্জনের ফলে চরম ও বিশৃঙ্খল পরিবেশে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

৬. রাজনৈতিক অবস্থান: অভিযোজনের ফলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বর্তমানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশের দুলধারার রাজনৈতিক ধারায় স্বকীয় অংশগ্রহণ করে থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি জাতিরাষ্ট্রের অংশ হয়েই এখনিক গোষ্ঠী বেঁচে থাকে। মূলধারার গোষ্ঠীর কাছ থেকে তারা সবসময় অসম অবস্থার স্বীকার হয়। তবুও তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।



নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি

নৃগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক প্রকৃতি: দু' একটি কথায় নরগোষ্ঠী ও এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্য সম্পর্কের প্রকৃতি ও ধরন বিকৃত করা খুবই কঠিন। এ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. সংখ্যালঘুদের জন্য আইনি প্রতিরক্ষা প্রদান: সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মনোভাব নিষেধমূলক ও. শত্রুতামূলক। এসব সমাজে সংখ্যালঘুরা নানারূপ বঞ্চনা, এমনকি দৈহিক নির্যাতনেরও শিকার হয়।

২. আত্তীকরণ: একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যপ্রক্রিয়া হলো আত্তীকরণ। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যা গোষ্ঠী অন্যকোনো বাক্তি বা গোষ্ঠীর মনোভাব, মূল্যবোধ, আচার আচরণ প্রভৃতি গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের জীবনধারার অংশীদার হয়ে পড়ে বা একই সাংস্কৃতিক জীবনের শরিক হয়ে যায়।

৩. সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ: সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সকল গোষ্ঠীর মানুষ সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা সংস্কৃতির সহাবস্থানাক সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ বাল। যে সমাজে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নীতি অনুসৃত হয়, সেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রাখার ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।

৪. নির্মূলকরণ: সংখ্যাগুরু প্রভাবশালী ধরনের জনগোষ্ঠী কর্তৃক সংখ্যালঘু দুর্বল জনগোষ্ঠীকে গণহত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

৫. অবিরাম পরাভূতকরণ: এ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবিদাওয়া, অধিকার এমনকি মানবিক আবেদন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হয় এবং তাদের উপরে চিরকালব্যাপী শাসন-শোষণ নির্যাতিত করে রাখার উদ্দেশ্যে নানা ধরনের নেতিবাচক পন্থা পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়।

৬. বিতাড়িতকরণ বা নির্বাসনে পাঠানো: প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সাথে বা সংখ্যালঘু কোনো গোষ্ঠীর সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটলে বা শত্রুতা সৃষ্টি হলে কিংবা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করলে একমাত্র সমাধান হিসেবে সংখ্যালঘুদের একাধিক স্থানে অথবা দেশের বাইয়ে জোরপূর্বক নির্বাসিত করা হয়।

উপরিউক্ত বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে বলা যায় যে, প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন ধরানের সংখ্যালঘু, যা এখনিক অপ্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্কের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কী? সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা লেখ।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বলতে কী বুঝায়? সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা লিখ

ভূমিকা: সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। এসব এথনিক গোষ্ঠী তথা নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সুগম হচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব, সাংস্কৃতিক অভিযোজন, অঙ্গীভূতকরণ, উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ, আদান-প্রদান নীতি ও বহু সংস্কৃতিযাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণা বেগবান হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কী? সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা লেখ।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান: ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শপূর্ণ বিরোধ থাকা সত্ত্বেও মানুষ ইতিবাচক নিখক্রিয়ার পথ সুগম করে একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্য, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ গড়ে তোলে এবং গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। মানুষের এই প্রচেষ্টা নিরন্তর, যা বহুমুখী বিভাজির সাংস্কৃতিকে আপেক্ষিকতার মাধ্যমে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা করে থাকে। সংস্কৃতিগত দ্বন্দ্বের অনুপস্থিতি মানুষকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বাধ্য করেছে।

প্রতিটি এখনিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা নিজেরা যখন তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে তখন তারা তাদের নিজস্ব ভাষার কথা বলে থাকে, কিন্তু যখন তারা অপরাপর জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তখন তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। তারা বাংলা ভাষাকে সাদরে গ্রহণ করে ভাষাগত সমন্বয় সাধন করেছে। এথনিক জনগোষ্ঠীরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের সমাজে প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বকীয় অংশগ্রহণ করে থাকে। ফলশ্রুতিতে এথনিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতিও গতিশীল হয়েছে। এখনিক জনগোষ্ঠীর সাথে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি বসবাস একে অন্যকে জানার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফলশ্রুতিতে তাদের ভেতরে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে এবং সহাবস্থানকে আরও বেশি শান্তিপূর্ণ করেছে। প্রতিটি এথনিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্ম রয়েছে এবং তারা তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে পালন করে থাকে। সাম্প্রতিককালে এথনিক জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহাগত ধর্ম ত্যাগ করে অধিকাংশই খ্রিষ্টান ও হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে। ফলশ্রুতিতে ধর্মীয় সম্প্রীতি সহাবস্থানকে সুদৃড় করেছে। প্রতিটি এথনিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকলেও অনেক এথনিক জনগোষ্ঠীর ভাষা লেখার বর্ণমালা নেই। আবার অনেক এথনিক জনগোষ্ঠীর ভাষা লেখার বর্ণমালা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। ফলশ্রুতিতে এথনিক জনগোষ্ঠীরা দিন দিন ক্রমাগতভাবে বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণে আকৃষ্ট হচ্ছে। এর ফলে সহাবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ফলে এখনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারার সাথে বিভিন্ন এথনিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা বর্তমানে স্বকীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে ভাষাগত সমন্বয় সাধন হচ্ছে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক ঐক্য সাধন, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, শিক্ষার এই একত্রীকরণ, সামাজিক উন্নয়ন প্রভৃতি ঘটছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এথনিক জনগোষ্ঠীর স্বকীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।


সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস ও বিবাহপ্রথা

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে অন্যতম হলো সাঁওতাল। সাঁওতাল উপজাতি উপমহাদেশের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। এরা এদেশের অধিবাসী নয়। সাঁওতালরা প্রথম কবে, কোথা থেকে এবং কীভাবে এ উপমহাদেশে এসেছিল, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। তারপরেও সাঁওতালরা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে এবং এখানে তারা পূর্ণাঙ্গভাবে জীবনযাপন শুরু করে।

সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাস: সাঁওতালদের শিক্ষিত সমাজে হিন্দুদের প্রধান প্রধান দেবদেবীর প্রাধান্য বর্তমান। বেগাভীল, গন্দি, কোল, কোরকা এবং সাঁওতাল প্রভৃতি উপজাতিদের আচার-ধর্ম ও ভাষ্যর সঙ্গে হিন্দুদের আচার-ধর্ম ও ভাষা এমনভাবে অতপ্রোতভাবে জড়িত যে, তাদের বৈশিষ্ট্য অনেকটা পৃথক এবং এজন্য এরা এখনও আদিবাসী তথা উপজাতি হিসেবে পরিগণিত। সাঁওতালদের দেবতার মধ্যে প্রধান হলো 'মারাং বুরো'। গ্রামের বা নিজেদের সকল প্রকার মঙ্গল-অমঙ্গল মারাং বুরোর ইচ্ছায়ই ঘটে থাকে বলে সাঁওতালরা বিশ্বাস করে থাকে। এ কারণে তার উদ্দেশ্যে সাদা মোরগ ও সাদা ছাগল উৎসর্গ করে তাকে সন্তুষ্ট রাখতে হয়। তা ছাড়া কোনো উৎসব উপলক্ষ্যে প্রচুর মদও মারাং বুরোর নামে উৎসর্গ করা হয়।

সাঁওতালদের বিবাহপ্রথা: সাঁওতালদের সমাজে উপগোত্রের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। বর্তমানে তিন ধরনের বিবাহ রীতি প্রচলিত। যথা- আসলি বিবাহ, রাজারাজি ও হরকাটরা বিবাহ। আসলি বিবাহ ছেলে এবং মেয়ের অভিভাবকদের সম্মতিতে হয়। রাজারাজি বা মনোমিলন বিয়ের জন্য যুবক-যুবতীরা হাটে যায় এবং তারা উভয়ে উভয়কে পছন্দ করলে কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তির মাধ্যমে বিয়ের কার্য সম্পন্ন হয়। আর জ্বরকাটরা বিয়েতে যুবক-যুবতীতে জোর করে বিয়ে করে। এরূপ বিয়েতে যুবক তার পছন্দনীয় যুবতীকে যে-কোনো উপায়ে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। সাঁওতালদের সামাজিক নিয়মে ফোনো যুবতীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিলে সে মেয়ের আর অন্যত্র বিয়ে হতে পারে না। এরপর নিয়মানুসারে গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তাদের বিবাহ সম্পন্ন করা হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বিবাহ ও ধর্মের ক্ষেত্রে তারা ঐতিহ্যবাহী নিয়মকানুন অনুসরণ করে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার প্রসারের ফলে এদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।